মোঃ তৌফিকুল ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে দ্রুত বিচার এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারের দাবিতে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১২ মে) রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত পুরাতন ফজিলতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, রাত ১১টার দিকে ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী হলে ফিরছিলেন। এসময় এক ব্যক্তি তার পিছু নেয়। পরে পুরাতন ফজিলতুন্নেছা হল সংলগ্ন সড়কে এসে ওই ব্যক্তি শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। ভুক্তভোগী তাকে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী কিনা জানতে চাইলে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে পাশের বিশমাইল এলাকায় থাকার কথা জানান। কথোপকথনের একপর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি কাপড় দিয়ে শিক্ষার্থীর গলা পেঁচিয়ে তাকে অন্ধকার স্থানে টেনে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরে ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে আশপাশের কয়েকজন ঘটনাস্থলে এগিয়ে গেলে অভিযুক্ত পালিয়ে যায়। পরে শিক্ষার্থীরা ভুক্তভোগীকে আতঙ্কিত অবস্থায় জঙ্গলের পাশ থেকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই শিক্ষার্থীর শরীর ও কাপড়ে মাটি লেগে ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিৎসক তানভীর হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, খুবই ন্যাক্কারজনক একটি ঘটনা ঘটেছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তকে শনাক্তের চেষ্টা করছি, তবে এখনো তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় রয়েছে। আমরা আশা করছি, অন্য কোনো ফুটেজ থেকে তার পরিষ্কার ছবি পাওয়া যাবে। প্রশাসন ভুক্তভোগীর পাশে রয়েছে এবং দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার (১৩ মে) দুপুর দেড়টায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সংসদের উদ্যোগে বিভাগের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রক্টর অফিসের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা আট দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অভিযুক্তকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নির্জন এলাকায় আলোর ব্যবস্থা, সিসিটিভি মনিটরিং জোরদার, নিরাপত্তাকর্মী বৃদ্ধি ও রাতের টহল জোরদার, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি হেল্পলাইন চালু এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সংসদের ভিপি জিহাদ বলেন, গতরাতে ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় আমরা গভীর ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা জানাই। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধির কারণেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশাসনিক অবহেলা ও বহিরাগতদের অবাধ বিচরণের কারণে আজ শিক্ষার্থীরা নিজেদের ক্যাম্পাসেই অনিরাপদ বোধ করছে।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৫১তম ব্যাচের এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, কিছুদিন আগেই আমাদের এক বান্ধবীকে ইসলামনগর এলাকায় হত্যা করা হয়েছে। এখনো সেই ঘটনার বিচার হয়নি। অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী নিজের ক্যাম্পাসে অনিরাপদ অনুভব না করে।
এরই প্রেক্ষিতে রাত ১১টার দিকে অভিযুক্তের বিচার এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ডাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
মিছিলটিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়। সেখানে নারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পুরুষ শিক্ষার্থীকেও অংশ নিতে দেখা যায়।
বিচারের দাবিতে আয়োজিত মিছিলে কয়েকজন শিক্ষার্থী ভিসি ও প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান ও বক্তব্য দিতে থাকেন। এতে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী। পরে তাদের একটি অংশ বিক্ষোভস্থল ত্যাগ করেন।
বিক্ষোভস্থল থেকে ফিরে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম ব্যাচের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আফ্রিদি বলেন, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছি অভিযুক্তের বিচারের দাবিতে। আমরা ভেবেছিলাম আজকের কর্মসূচি থেকে প্রশাসনের কাছে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে দাবি জানাবো এবং সেখান থেকে আশ্বাস নিয়ে ফিরবো। কিন্তু এখানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কিছু শিক্ষার্থী কর্মসূচিকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা কারও পদত্যাগের দাবিতে এখানে আসিনি। এজন্যই আমরা চলে যাচ্ছি।
এদিকে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংগঠক সোহাগী সামিয়া বলেন, আমাদের এক বোনকে গতকাল ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির দ্রুত আটক চাই এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই



















