প্রতিবেদক
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার নির্ণয়ের একটি মেশিন—৭ বছর ধরে বাক্সবন্দী। দাম ২০ কোটি টাকা। আজও ব্যবহার হয়নি। মেশিনটি ভালো না নষ্ট, সেটাও কেউ জানে না। এর দায় কেউ ঘাড়ে নিতে চায় না, চাপানোও যাবে না—এটা বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে কেনা হয়েছিল। এর নাম যদি রাখি “দায়িত্বহীনতার স্মারক,” খুব বেশি ভুল হবে না।
আমাদের স্বাস্থ্য খাত যেন সোমনাথ মন্দির—লুট হয়, কিন্তু হিসাবের খাতা খুলে না। গলা ফাটিয়ে বললেও লাভ নেই। কারণ, নীতি-নৈতিকতা এখন দেশজুড়ে নির্বাসিত।
সেদিন এক বন্ধু বলল, “এই তো আছি, ধর ভালো লাগে… ঘোরেতে, ঠেলায়।” কথাটা শুনে থমকে গেলাম। জানতে চাইলাম, এটা কোথা থেকে? সে হেসে জানাল বরিশালের এক নারী ভোটার ভোট দিয়ে আবার লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, সাংবাদিক জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দেন, “এই ধরেন ভালো লাগে, ঘোরেতে, ঠেলায়!”
ভাবুন—ভোটের মতো গুরুতর বিষয়ও এখন এমন মজা, এমন নাটক!
এই ঘোর শুধু ভোটে নয়, সংস্কৃতিতেও। কলকাতার ভোটে অংশ নিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা ফেরদৌস! এক দেশের নাগরিক অন্য দেশের ভোটের মঞ্চে? আইন-কানুনের তোয়াক্কা কোথায়? আবেগে কাজ করেছেন তিনি—ঠিক আছে, কিন্তু তার এ আবেগ কেবল ব্যক্তিগত নয়, দেশের ভাবমূর্তিতেও ছায়া ফেলেছে।
আমরা যদি কল্পনা করি—শাহরুখ খান কিংবা অমিতাভ বচ্চন ঢাকায় এসে বিএনপি বা জাতীয় পার্টির র্যালিতে অংশ নিলেন, কী হতো তখন? সমর্থনের নামে বিদেশি হস্তক্ষেপ কেউ ভালো চোখে দেখে না।
এভাবে একেক সময় একেক গ্রুপ উঠে আসে, যারা “উৎসাহী সার্কাস” করে চারপাশ এলোমেলো করে দেয়। এদের অতিরিক্ত তৎপরতা দল ও দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপির ভেতরে আজ অনেক নেতা বলছেন—আমাদের দলের ভেতরেও এখন আওয়ামী লীগের ছায়া। শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, এর ফলেই জন্ম নিচ্ছে সামাজিক হতাশা, নৈতিক অবক্ষয়।
আমাদের নেতারা বুঝবেন কবে—আইনের শাসন ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না?
রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বললাম। এবার আসি বেদনার কবিতায়। রবীন্দ্রনাথকে আমরা সুখের কবি বলে জানি, অথচ তাঁর জীবনের পেছনে লুকিয়ে আছে একের পর এক বিয়োগান্ত কাহিনি—মা, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধুজন—প্রত্যেকের মৃত্যুই তাঁকে নতুন করে লেখালিখির জগতে ঠেলে দিয়েছে। ‘যদি আর বাঁশী না বাজে’ কবিতা নয়, তাঁর বিদায়বার্তা।
কাজী নজরুল—আরেক দুঃখী আত্মা। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে বিধ্বস্ত, স্ত্রী প্রমীলার পক্ষাঘাতে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে তিনি লিখেছিলেন—‘আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, আমি প্রেম পেতে এসেছিলাম…’ এসব লাইনে যন্ত্রণা কাঁপে, ইতিহাস বয়ে চলে।
কেউ রাজনীতিক, কেউ কবি, কেউ সাধারণ ভোটার—সবাই কারও না কারও অপূর্ণতা নিয়ে হাঁটে। যারা রাজনীতি করেন, তারা তো বড্ড একা। ক্ষমতা আসে, কিন্তু প্রকৃত কর্মীদের মূল্যায়ন না হলে তারা বুকের ভেতর ক্ষোভের আগুন নিয়ে বাঁচেন। চাটুকারদের আসন হয় উঁচু, আর ত্যাগী কর্মীরা হয়ে যান অতীতের পাতা।
আজ চারদিকে অনেক খন্দকার মোশতাক, অনেক তোষামোদকারী। অথচ প্রয়োজন দক্ষ, নীতিবান মানুষ, যাদের নিয়ে গড়া যায় স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ।
মানুষ চায় পদ্মা সেতু, চায় রূপপুর, চায় মেট্রোরেল। কিন্তু সব কিছুর আগে চায় আইনের শাসন। আইন না থাকলে উন্নয়নও গর্তে পড়ে যায়। শেখ হাসিনা এই দেশের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু তার নেতৃত্বও টেকসই হবে তখনই, যখন ঘর সামলে বাইরে পা বাড়ানো যাবে।
সব শেষে বলি—আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একান্ত সন্তান। সেদিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো গন্তব্য নেই।


















